শনিবার । ১১ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২৮শে চৈত্র, ১৪৩২
তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন

বাগেরহাটে মাজার সংলগ্ন দিঘির ঘাট থেকে কুকুরকে ধরে নিয়ে গেল কুমির

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট

বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী খানজাহান আলী (রহঃ) এর মাজার সংলগ্ন দিঘির কুমির একটি কুকুরকে শিকার করেছে। গত বুধবার বিকেলে মাজারের প্রধান ঘাট থেকে কুকুরটিকে নিয়ে যায় মাজারে থাকা একমাত্র কুমির ধলা পাহাড়।

কুকুরটিকে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই দাবি করেন কুকুরটিকে হাত-পা বেঁধে কুমিরের সামনে দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ বলছেন, মাজারের খাদেমরা কুমিরকে কুকুর খাওয়ায়। এ ঘটনায় সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তবে ভিডিও বিশ্লেষন ও প্রতক্ষদর্শীদের ভাষ্য, কুকুরটি অসুস্থ ছিল, অনেককে কামড় দিয়েছে এবং ঘটনার দিন কুকুরটি নিজে থেকেই ঘাটে এসেছিল। তারপর কুমিরে ধরে নিয়ে যায়। পরে কুকুরটির মৃতদেহ ভেসে উঠলে মাজারের খাদেমরা মাটি চাপা দেয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ৫৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায় একটি কুকুর ঘাটে অর্ধেক পানিতে নেমে আছে। মুহূর্তের মধ্যে কুকুরটি পানির আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করে। আর কুমিরটি আসতে থাকে। কুমিরটি যখন কাছে চলে আসে, তখন কুকুরটি উপরে উঠে বাঁচার চেষ্টা করলেও, পারেনি। কুমিরটি কুকুরটিকে ধরে পানির নিচে নিয়ে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, অন্যান্য দিনের মতো বুধবার বিকেলেও মাজার সলগ্ন ঠাকুর দিঘির প্রধান ঘাটে দর্শনার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড় ছিল। তাদের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন মাজারের খাদেমদের নিয়োগকৃত নিরাপত্তা প্রহরী ফোরকান হাওলাদার। হঠাৎ করে নারীদের ঘাটের দিক থেকে আক্রান্ত কুকুরটি দৌড়ে আসে এবং প্রধান ঘাটে থাকা নিরাপত্তা প্রহরী ফোরকানের পায়ে কামড় দেয়। ফোরকান পা ঝাঁকি দিলে দর্শনার্থীদেরও কামড় দেওয়ার চেষ্টা করে কুকুরটি। নিরাপত্তা প্রহরী কুকুরটিকে নিবৃত করার চেষ্টা করলে, কুকুরটি ঘাটের নিচের দিকে নামার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে দিঘির মধ্যে থেকে কুমির এসে ছোঁ মেরে কুকুরটিকে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে কুকুরটির মরদেহ পাওয়া যায় এবং মাজারের খাদেমরা কুকুরটিকে মাটি চাপা দেয়।

খাদেমদের দাবি, কুকুরটি অসুস্থ ছিল, কয়েকজনকে কামড়ও দিয়েছে। আর কুমিরের মুখ থেকে কুকুরকে বাঁচাবে এমন সাহস হয়নি কারো।

প্রত্যক্ষদর্শী ও মাজারের নিরাপত্তাকর্মী ফোরকান হাওলাদার বলেন, সে সময় ঘাটে কুমিরটি অবস্থান করছিল। অনেকে সেখানে দাঁড়িয়ে কুমির দেখছিলেন। ডিম পাড়ার পরে কুমিরটি একটু হিংস্র হয়ে গেছে। নিরাপত্তার জন্য তাই ঘাটেই ছিলাম। হঠাৎ করে নারীদের ঘাট থেকে দৌড়ে এসে তার পায়ে কামড় দেয়। পা ঝাঁকি দিলে, আরও একজন দর্শনার্থীকে কামড় দেওয়ার চেষ্টা করে। কুকুরটিকে নিবৃত করার চেষ্টা করলে, ও পানির মধ্যে নামতে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই কুমির এসে কুকুরটিকে ধরে পানির নিচে নিয়ে যায়। প্রায় আধা ঘণ্টা পর কুকুরটি দিঘির অন্য পাশে ভেসে উঠলে তাকে উদ্ধার করে মাটিচাপা দেয়া হয়।

মাজারের নারীদের ঘাটের পাশের দোকানি বিনা আক্তার বলেন, তাঁর দোকানের সামনেও কয়েকজনকে আক্রমণ করে কুকুরটি। তিন বছরের একটা বাচ্চাকেও কামড়ায়। তার তিনটি মুরগিও মেরে ফেলেছে কুকুরটি। কুকুর পানিতে পড়লে কুমির ধরে নিয়ে যায়। এ নিয়ে এখন নানা মিথ্যা গল্প বানানো হচ্ছে।

বিভিন্ন সময় মাজারের এই কুমিরকে খাবার দেওয়া এবং কুমির নিয়ে ভিডিও তৈরি করা পরিচিত মুখ স্থানীয় যুবক মেহেদী হাসান (তপু) বলেন, কুমিরটি কয়েকদিন আগে ডিম পেড়েছে। ডিম পাড়লে মা কুমির হিংস্র হয়ে যায়। ঘটনার সময় আমি ছিলাম না। সেখানে অনেক লোক ছিল সবাই ভিডিও করেছে। আর হিংস্র কুমিরের মুখের সামনে থেকে কুকুর ছিনিয়ে আনার মতো সাহসতো সবার থাকে না।

খানজাহান (রহ.)-এর মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তারিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরালের নেশায় ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। নানা ধরনের ভুল তথ্য ছাড়ানোর প্রেক্ষিতে আমরা এ বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়রি করেছি। আমরা যেটা শুনেছি, কুকুরটি নিজে থেকে ঘাটে গেছে। কেউ তাকে বেঁধে বা ঠেলে দিঘিতে ফেলায়নি।

এদিকে কুকুরের মৃত্যুর ঘটনার বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিয়া খাতুনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন, বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। আজ শনিবার বিকেলে মাজার এলাকায় কুকুরের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রাণী সম্পদ বিভাগের সতত্ত্বাবধায়নে এই ময়নাতদন্ত হয়। কুকুরটি মাথা ঢাকার সেন্ট্রাল ডিজিজ ইনভেস্টিগেশন ল্যাবরেটরি (সিডিআইএল) এ পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট পেলে কুকুরটি অসুস্থ ছিল কিনা বা জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত ছিল কিনা তা জানা যাবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছাহেব আলী।

তিনি বলেন, আমরা নিয়ম অনুযায়ী ময়নাতদন্ত করেছি। কুকুরটির মাথা সিডিআইএল-এ পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)‘র সদস্য শেখ মোহাম্মাদ নূর আলম বলেন, মাজারে কুমিরে যে কুকুরটিকে নিয়েছে বিষয়টি খুব হৃদয় বিদারক। কেউ যদি আনন্দ পাওয়ার জন্য বা ভিউ বাণিজ্যের জন্য কুকুরটিকে ধরে কুমিরের মুখে দেয় তাহলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান এই পরিবেশকর্মী।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন বলেন, মাজারের দিঘিতে কুমিরকে কখনোই কুকুর খেতে দেওয়া হয়না। আমার জানা মতে এটা ভিত্তিহীন। তবে অনেক সময় ভক্তরা চান তাদের মুরগিটা কুমিরের জন্য ছুড়ে দিতে। ছুড়ে দিলে ওই মুরগিটা আমার পাড়ে চলে আসে। এ ধরনের জীবিত প্রাণী ছুড়ে দেওয়া কুসংস্কার এগুলো বন্ধ করা দরকার। খাদেমসহ যারা মাজারের দেখাশুনার দায়িত্বে আছেন তাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছি, কুমিরের খাবার হিসেবে যেন কোনো জীবন্ত প্রাণী দিঘিতে না ফেলা হয় এবং এ বিষয়ে যেন তারা সতর্ক থাকেন।

তিনি আরও বলেন, প্রাণীটির শরীরে কুমিরের আঘাত ছাড়া আর কোনো আঘাত আছে কিনা তাও দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটি সবার সঙ্গে কথা বলবে এবং প্রাথমিকভাবে যা পাবে তার উপর ভিত্তি করে দ্রুতই একটি প্রতিবেদন দিয়ে দিবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার অনুরোধ করেন এই কর্মকর্তা।

খানজাহান আলী (রহ) এর মাজার সংলগ্ন দিঘিতে খানজাহান প্রথম কুমির ছেড়েছিলেন। প্রাচীন আমলের সেই কুমিরের বংশধর দীর্ঘদিন ধরে মাজারে থাকলেও বর্তমানে প্রাচীন আমলের কোনো কুমির নেই। ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজ থেকে আনা ৫টি কুমিরের একটি মাত্র কুমির দিঘিতে আছে। যে কুমিরটি কুকুরকে শিকার করার আগেও বিভিন্ন সময় মানুষের উপরও আক্রমণ করেছে।




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন